মোটা হওয়ার উপায়

মোটা হওয়ার উপায়
Telegram Channel Join Now

আধুনিক জীবনে, আমরা প্রায়শই ওজন কমানোর প্রচেষ্টার কথা শুনি, তবে কিছু লোক আছে যারা স্বাস্থ্যের কারণে বা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে দ্রুত ওজন বাড়াতে চায়। হঠাৎ করে ওজন কমে যাওয়া, শারীরিক দুর্বলতা বা ওজন কম হওয়া অনেকেরই সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই সঠিকভাবে ওজন কিভাবে বাড়ানো যায় তা জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটা শুধু বেশি খাওয়ার ওপর নির্ভর করে না; স্বাস্থ্যকর ওজন বৃদ্ধি শুধুমাত্র সুষম পুষ্টি, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমেই সম্ভব। এই নিবন্ধে, আমরা দ্রুত ওজন বাড়ানোর কার্যকর উপায়গুলি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

মোটা না হওয়ার কারণ কী?

অনেকেই পর্যাপ্ত খাবার খেয়েও ওজন বাড়াতে পারেন না, যা অনেকের জন্য হতাশার কারণ। এর পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, বংশগত কারণগুলি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদি আপনার পরিবারের সদস্যরা স্বাভাবিকভাবে পাতলা হয়, তবে জেনেটিক প্রভাবের কারণে ওজন বাড়ানো সহজ নয়। অধিকন্তু, আপনার যদি উচ্চ বিপাক হয়, তবে শরীর দ্রুত ক্যালোরি পোড়ায়, তাই অতিরিক্ত খাওয়ার পরেও তারা চর্বিতে পরিণত হয় না। তৃতীয়ত, অপুষ্টি এবং অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ওজন না বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টিকর, ক্যালরি-সমৃদ্ধ খাবার না খেলে শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি এবং পুষ্টি পায় না, যার ফলে ওজন বেড়ে যায়। হরমোনজনিত সমস্যা যেমন হাইপারথাইরয়েডিজম বিপাক বৃদ্ধি করে, যা ওজন বৃদ্ধি রোধ করতে পারে। উপরন্তু, মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা যেমন ডায়াবেটিস, হজমের সমস্যা বা সংক্রামক রোগ ওজন কমানোর কারণ হতে পারে। অতএব, কেন আপনার ওজন বাড়ছে না তার কারণগুলি বোঝা এবং উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হল একটি সুস্থ জীবন অর্জনের দিকে প্রথম পদক্ষেপ।

মোটা হওয়ার সহজ উপায়

সমস্যা যখন রয়েছে তখন এর সমাধানও আছে। মোটা হওয়ার জন্য কিছু সহজ পদ্ধতি চলুন জেনে নেই।

১। ব্যায়াম করা

অনেকেই ভেবে থাকেন ওজন কমাতেই ব্যায়াম প্রয়োজন, কিন্তু এই ধারণা মোটেও ঠিক না। ওজন কমাতে যেমন ব্যায়াম প্রয়োজন ঠিক তেমনি ওজন বাড়াতেও ব্যায়াম করা খুবই প্রয়োজন। এক্ষেত্রে শুধু দৌড় ঝাঁপই যথেষ্ট না। দরকার প্রতিদিন নিয়ম করে জিম করা। জিমে অভিজ্ঞ ট্রেইনার থাকেন। আপনার ওজন এবং চেহারা দেখে তিনিই আপনাকে বলে দিবেন কোন ব্যায়াম আপনার করতে হবে।

২। বার বার খাবার গ্রহণ

বার বার খাবার গ্রহণ প্রতিটি মানুষেরই করা উচিৎ। প্রতি ২ ঘন্টা অন্তর অন্তর অল্প করে কিছু খেতে হবে। কিন্তু যারা ওজন বৃদ্ধি করতে চাচ্ছেন তারা ২ ঘন্টা পর পর বেশি করে খেতে হবে। এসময় আপনি দুধ, দই, ফল, ছানা ইত্যাদি দিয়েই পূরণ করতে পারেন। এতে আপনার শরীরে পুষ্টির পাশাপাশি ওজনও বৃদ্ধি পাবে। এটি মোটা হওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়।

৩। খাবারে রাখুন কার্বোহাইড্রেড

ওজন বৃদ্ধিতে কার্বোহাইড্রেড খুবই প্রয়োজন। খাবারের তালিকায় কার্বোহাইড্রেড অবশ্যই রাখবেন। ভাত ও রুটি কার্বোহাইড্রেডের প্রধান উৎস। তাই প্রতিদিন অন্তত ২ বার কার্বোহাইড্রেড খাবেন। ভাত ও রুটি কার্বোহাইড্রেডের প্রধান উৎস তার মানে এই নয় যে বেশি বেশি খাবেন। আপনাকে অতিরিক্ত ফ্যাটের দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। তাই প্রতিদিন কার্বোহাইড্রেড খাবেন পরিমিত কিন্তু সাধারণের তুলনায় কিছুটা বেশি। মোটা হওয়ার সহজ উপায় গুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

৪। বেশি ক্যালোরি গ্রহন

ওজন কমানোর ক্ষেত্রে আমরা বেশি ক্যালোরি বার্ন করি এবং কম ক্যালোরি গ্রহণ করি। কিন্তু এই ক্ষেত্রে উলটা হবে যতটুকু ক্যালোরি বার্ন করবেন তার দ্বিগুণ ক্যালোরি গ্রহণ করতে হবে। ওজন বৃদ্ধির জন্য শরীরের চাহিদার তুলনায় বেশি ক্যালোরি নিন। ওজন দ্রুত বৃদ্ধি করতে চাইলে দিনে ৬০০-৭০০ ক্যালোরি বেশি গ্রহণ করতে হবে আর যদি ওজন আস্তে আস্তে বাড়াতে চান তাহলে প্রতিদিন ৪০০-৫০০ ক্যালোরি বেশি গ্রহণ করতে হবে। এভাবে এক সপ্তাহ করলেই আপনার ওজন বৃদ্ধি পাবে।

৫। সঠিক প্রোটিন গ্রহণ

ওজন বৃদ্ধি করতে শুধুমাত্র ক্যালোরিই যথেষ্ট না। ক্যালোরির পাশাপাশি সঠিক প্রোটিন গ্রহণ করতে হবে। সঠিক প্রোটিন গ্রহন না করলে ক্যালোরি বাড়তি ফ্যাটের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাই প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় প্রোটিন জাতীয় খাবার যেমন ডিম, ডাল ও দুধ অবশ্যই রাখবেন।

৬। ড্রাই ফ্রুটস খাবেন

ড্রাই ফ্রুটসে আছে প্রচুর ক্যালোরি ও ফ্যাট যা ওজন বৃদ্ধিতে অনেক কাজে দিবে। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই ২টি কাজু ও ২টি কিসমিস খাবেন। এইটা কোনভাবেই ভুলবেন না। আর সকালের নাস্তায় রাখুন আমন্ড বা পেস্তা। ওজন বৃদ্ধিতে আপনার ডায়েট চার্টে বাদামের পরিমাণ বেশি রাখুন। এভাবে নিয়ম মেনে ড্রাই ফ্রুটস খেলে দেখবেন এক মাসের মধ্যেই আপনার ওজন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৭। টেনশনমুক্ত থাকুন

সব সমস্যার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে টেনশন। ওজন বৃদ্ধিতে যেমন টেনশনমুক্ত থাকা প্রয়োজন ঠিক তেমনি ওজন কমাতেও টেনশনমুক্ত থাকা খুবই আবশ্যক। আজকাল টেনশনমুক্ত থাকা খুবই কঠিন তাও চেষ্টা করবেন যতটা সম্ভব টেনশনমুক্ত থাকার।

৮। পরিমিত ঘুমান

শরীর ঠিক রাখতে ঘুম খুবই প্রয়োজন। প্রতিদিন ৮ ঘন্টা অবশ্যই ঘুমাতে হবে। এর থেকে কম হওয়া যাবে না। এছাড়া ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিন নিয়ম করে ইয়োগা বা যোগাসন করুন। এতে আপনার ওজন দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।

৯। ঘুমানোর আগে দুধ মধু খান

ঘুমোতে যাওয়ার আগে এমন কিছু খেতে পারেন যা বেশ পুষ্টিকর এবং ক্যালোরিযুক্ত। কারণ সেটা ঘুমিয়ে পরছেন বলে খরচ হচ্ছে না এবং পুরো রাত আপনার শরীরে ক্যালোরির কাজ করবে এবং ওজন বৃদ্ধি করবে। তাই প্রতিদিন ঘুমানোর আগে দুধ ও মধু মিশিয়ে খান। এটি ওজন বৃদ্ধিতে পরীক্ষিত এবং মোটা হওয়ার সহজ উপায়।

১০। ডায়েটে চকলেট এবং চিজ রাখুন

সচরাচর বাহিরের খাবার খেতে আমরা নিষেধ করে থাকি। কিন্তু ওজন বৃদ্ধিতে বাহিরের খাবার যেমন আইসক্রিম, পেস্ট্রি, বার্গার ইত্যাদি খাবার খুবই কার্যকরী। এতে ফ্যাট থাকে, বেশি খেলে শরীরের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর! তাই আপনি চাইলে এগুলো খেতে পারেন কিন্তু তা হবে পরিমাণমতো। আপনার প্রতিদিনের ডায়েটে চকলেট এবং চিজ রাখতে পারেন।

সাত দিনে মোটা হওয়ার উপায়

ওজন বাড়ানোর জন্য সবচেয়ে কার্যকরী উপাদান হল চর্বি। তাই চর্বি বা ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। যাইহোক, আপনি যদি মাত্র সাত দিনে দ্রুত ওজন বাড়াতে বা মোটা হতে চান তবে আপনার নিয়মিত ডিম, মাখন, ঘি, কোমল পানীয়, চিপস এবং চকলেট জাতীয় খাবার খাওয়া উচিত। এছাড়া গরু ও ছাগলের মাংসে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন থাকে, যা আপনার ওজন বাড়াতে সাহায্য করবে।

দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম উচ্চ-ক্যালরিযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস করুন। উচ্চ-ক্যালরিযুক্ত খাবার খেলে, আপনি মাত্র সাত দিনে নিজের মতো দেখতে পারেন। আপনি যদি দ্রুত বা সাত দিনে ওজন বাড়াতে চান তবে উপরের ধাপগুলি অনুসরণ করুন; এটি সাত দিনে ওজন বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

কি খেলে মোটা হওয়া যায় তাড়াতাড়ি

আপনি যদি আপনার খাদ্যাভাস বা দ্রুত ওজন বাড়াতে আপনার খাওয়া উচিত এমন খাবারের তালিকা না জানেন, তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক সেই খাবারগুলো যা আপনাকে দ্রুত ওজন বাড়াতে সাহায্য করে। আমরা ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি যে কোন খাবারগুলি আপনাকে সাত দিনের মধ্যে ওজন বাড়াতে দেয়, আপনি যদি সেগুলি ক্রমানুসারে খান তবে আপনি আপনার স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে বা ওজন বাড়াতে পারেন।

উল্লিখিত খাবারের পাশাপাশি, বাদাম, ছোলা, মাংস, দুধ, মধু, খিচুড়ি, ফলের রস ইত্যাদি খেলেও আপনি ওজন বাড়াতে পারেন। উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার খেলে ওজন বাড়তে পারে। তাই দ্রুত ওজন বাড়াতে চাইলে এই খাবারগুলো খেতে পারেন। আশা করি দ্রুত ওজন বাড়ানোর এই কার্যকরী টিপসগুলো বুঝতে পেরেছেন।

FAQ

সকালে খালি পেটে কী খেলে ওজন বাড়ে?

  • সকালে খালি পেটে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার যেমন ডিম, দুধ, বা বাদাম খাওয়া উপকারী। এছাড়া কলা, খেজুর এবং শস্যজাতীয় খাবারও ওজন বাড়াতে সাহায্য করে। এসব খাবারে উচ্চ ক্যালোরি এবং পুষ্টি উপাদান থাকে যা ওজন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

রাতে কী খেলে ওজন বাড়ে?

  • রাতে উচ্চ ক্যালোরি এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার যেমন মুরগির মাংস, ডাল, টক দই, বাদাম, বা স্যুপ খাওয়া যেতে পারে। এছাড়া এক গ্লাস দুধ ওজন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

কোন ঔষধ খেলে ওজন বাড়ে?

  • ওজন বাড়ানোর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে কিছু ঔষধ যেমন অ্যাপেটাইট স্টিমুল্যান্টস (যেমন, মেগাসিট) বা ভিটামিন সাপ্লিমেন্টস (যেমন, ভিটামিন বি-১২) নেওয়া যেতে পারে। তবে, যেকোনো ঔষধ খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

কত ক্যালরিতে ১ কেজি ওজন বাড়ে?

  • ১ কেজি ওজন বাড়াতে সাধারণত ৭,৭০০ ক্যালোরি অতিরিক্ত গ্রহণ করতে হয়। তবে এটি ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন হতে পারে এবং স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন বাড়ানোর জন্য সঠিক ডায়েট ও ব্যায়াম জরুরি।

দ্রুত মোটা হওয়ার দোয়া ও আমল আছে কি?

  • ইসলামে মোটা হওয়ার জন্য কার্যকরী অনেক হাদিস রয়েছে, যা শরীরের সুস্থতা এবং ওজন বৃদ্ধির জন্য সাহায্যকারী। বিশেষত, খেজুর ও শসা একসঙ্গে খাওয়ার বিষয়ে সুন্নাহ রয়েছে। হাদিসে বলা হয়েছে, খেজুর এবং শসা শরীরের পুষ্টি উন্নত করতে সহায়ক। হজরত আয়েশা রা: বর্ণনা করেছেন, তার মা তাকে স্বাস্থ্যবান করে রাসূলুল্লাহ সা: এর কাছে পাঠানোর জন্য নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু কোন ফল পাওয়া যায়নি। শেষে, তিনি তাকে পাকা খেজুরের সাথে শসা খাওয়াতে শুরু করলে, আয়েশা রা: স্বাস্থ্যবান হয়ে ওঠেন। (সুনানে আবু দাঊদ, হাদিস নং ৩৯০৩)। এছাড়া, ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে সুস্থ শরীর এবং সুস্থ খাদ্যাভ্যাসের জন্য প্রাকৃতিক খাবার গ্রহণ এবং শরীরের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

ওজন বাড়ানো বা কমানোর পাশাপাশি যে কোনো শারীরিক ক্রিয়াকলাপের জন্যও পানি খুবই উপকারী। প্রচুর পানি পান করতে হবে। নিয়মিত ওজন বাড়াতে এই সহজ টিপসগুলো মেনে চললে আপনার ওজন বাড়বে এবং সুস্থ থাকবেন। নিজের যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন এবং ভালো থাকুন।